হাসান মাহমুদ: ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদনগর ইউনিয়নের  দক্ষিণ চরকালিদাস  এ গ্রামের একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চরকালিদাস কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে । ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালাভের জন্য পার্শ্ববর্তী মিরসরাই উপজেলার উত্তর মোবারকঘোনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বা বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠা কিন্ডারগার্টেনে যেতে হয় । এমন দুর্ভোগের শিকার হয়ে প্রাথমিকের গন্ডি পেরুনোর আগেই শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়ছে শত শত শিশু । অসুস্থ্য, দূর্বল ও শারিরিক প্রতিবন্ধি শিশুরা শিক্ষার আলো বঞ্চিত হচ্ছে। মানুষ তৈরীর কারখানাটি এখন ভূতের বাড়ী । সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ঝোপ-জঙ্গলে আবৃত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে চরকালিদাস গ্রামের শিক্ষার এ বাতি ঘরটি । বিদ্যালয়ের চারটি কক্ষে যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে সরকারি অর্থে কেনা মূল্যবান চেয়ার , টেবিল ও আলমারিসহ আসবাবপত্র । শিক্ষার্থীদের বসার টেবিল সেই কবে উই পোকায় খেয়ে পেলেছে । কালো ব্লাকবোর্ডে অনেক দিন দাগ পড়েনি সাদা চকের ।

স্থানীয়রা জানান , ১৯৯৩ সালে মরহুম হাজী রুহুল আমিন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তির অনুদানে ২৪ শতাংশ জায়গা স্থাপিত হয় চরকালিদাস কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয় । এছাড়াও বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় নুরুল আলম, মরহুম হাজী আবুল খায়ের, ইস্রাফিল সওদাগর, মাহবুবুল হক, আবুল বশর, আনিসুল হক ও কবির আহাম্মদসহ স্থানীয়দের সহযোগিতায় চলতো এ বিদ্যালটি । প্রতিষ্ঠাতার ছেলে সিরাজ উদ্দিনের স্ত্রী জাহেদা আক্তার রুমাকে প্রাধান শিক্ষক করে ৪ শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে বিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে। তার  সাথে শুরু থেকে স্থানীয় যুবক জামাল উদ্দিন, নাছিমা আক্তার ও খাদিজা আক্তার সম্পূর্ণ অবৈতনিকভাবে শিক্ষা দিয়েছেন এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে  বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল আমীন ও প্রধান শিক্ষক জাহেদা আক্তার রুমা মৃত্যুবরণ করলে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। অপরাপর শিক্ষকদের অন্যত্র বিবাহ ও চাকরী হলে চলে যায়। স্থানীয় যুবককরা কয়েকবার বিদ্যালয়টি চালু করার উদ্যোগ নিয়েও সফল হয়নি ।

স্কুল আঙ্গিনায় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সৃষ্ট জটলায় কথা হয় চরকালিদাস গ্রামের আনোয়ার হোসেনের শিশু সন্তান রায়হান হোসেনের সাথে। পাশ্ববর্তী মিরসরাই উপজেলার আনোয়ারা বেগম সরকারী প্রথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ে। বিদ্যালয় অনেক দূরে হওয়ায় কাঁচা রাস্তা দিয়ে হেটে যেতে কষ্ট হয়। উত্তর সোনাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যায়ের দ্বিতীয় শ্রেনিতে পড়া একই গ্রামের মাইন উদ্দিনের মেয়ে নাহিদা আক্তার প্রীতি। সে জানায়, স্কুল অনেক দূরে হওয়ায় নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না । একই গ্রামের এসএসসি পরীক্ষার্থী মৃত আমিন মিস্ত্রীর ছেলে মীর মোহাম্মদ রাপি। পাশ্ববর্তী মেহেরুন নেছা ফয়েজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শাখা থেকে পরীক্ষা দিচ্ছে সে। গ্রাম থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে আমাদের পড়া-লেখা  করতে হয়। এ বিদ্যালয়টি থাকলে আমাদের  এখানে শিক্ষার হার আরো বাড়তো । বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম হাজী রুহুল আমিনের ছেলে মজিবুল হক জানান, পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্কুলটি দীর্ঘদিন বন্ধ রয়েছে। সরকারী সহযোগিতায় স্কুলটি পুনরায় চালু হলে এ গ্রামের শিক্ষা বঞ্চিত শিশুরা শিক্ষার সুযোগ পাবে। সরকারী অনুদানে অবকাঠামোগত সমস্যা থাকলে আমরা স্কুলের
জন্য আরো জমি দান করবো ।

একই এলাকার মহিউদ্দিন বলেন, স্কুলটি পুনরায়  চালু করতে এলাকাবাসী যে কোন ধরণের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। আমরা চাই স্কুলটি পুনরায় চালু হোক। আমাদের সন্তানরা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাক । ষাটোর্ধ্ব রুহুল আমিন জানান, এ গ্রামের মানুষ সরকারী অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ।
এখানে স্কুল,স্বাস্থ্য কেন্দ্রতো দূরের কথা, হাটা-চলার একমাত্র সড়কটিও পড়ে আছে অযত্নে-অবহেলায়। প্রায় তিন কিলোমিটার সড়কে বর্ষাকালে কাদা-পানির মধ্যে চলাচল করতে হয় । ভোট এলে চেয়ারম্যান-মেম্বার প্রার্থীদের পা পড়ে এলাকায় । প্রতিশ্রুতি দিলেও কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না । স্থানীয় ফরহাদনগর ইউপি চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন টিপু জানান , স্কুলটি সম্পর্কে ইতোপূর্বে কেউ জানায়নি । বিষয়টি জানলে আমি উর্ধ্বতনের সহযোগিতায় স্কুলটি পুনরায় চালুর ব্যবস্থা নিতাম । সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন জানান , বিষয়টি আমাদের জানা ছিলোনা । স্কুলটি পুনরায় চালুর ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে ।

Share Button